একটি অসমাপ্ত আত্মদহন

আত্মদহন গল্প

খুব দ্রুত হাঁটছিলাম। ভার্সিটি থেকে বের হয়ে; টিএসসি থেকে নীলক্ষেতের দিকে। কাঁটাবনের মাথায় এসে রাস্তা ক্রস করবো, শুনতে পেলাম নারীকণ্ঠে কেউ একজন আমার নাম ধরে ডাকছে।

প্রথমটায় একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। ইট-কাঠ-পাথরের এই ঢাকা শহরে এরকম কেউ আমায় ডাকে না। একজনই শুধু ডাকতো- তিথি। সেটা সাত বছর আগে শেষবার হয়েছিলো।

এভাবে নাম ধরে ডেকে রাস্তার পাশে নিয়ে টাকা ছিনতাই হয়। ব্যাপারটা আমার মাথায় আছে। ডাক শুনে থমকে দাঁড়িয়েছি কিন্তু সেদিকে তাকাবো কিনা বুঝতে পারছি না। নাকি হাঁটা দেবো যেদিকে যাচ্ছিলাম সেদিকে?

আবারও শুনতে পেলাম আগের সেই কণ্ঠস্বর। এবার দাঁড়িয়েছিলাম। কণ্ঠটা পরিস্কার শুনতে পেলাম। সাথে সাথে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। তিথির কণ্ঠস্বর। আমি নিশ্চিত।

সাত বছর পর হঠাৎ তিথি কেন আমায় ডাকবে? সাত বছর আগেই তো সব চুকেবুকে গেছে। তিথি এখন শুধুই একটা দীর্ঘশ্বাস। এক পলকে চলে গেলাম অনেকগুলো বছর আগে।

.
দুই.

টিএসসিতে বসে আড্ডা দিচ্ছি আমরা অনেকগুলো বন্ধু। ইউনানী চমৎকার গীটার বাজাতো। আমি ছিলাম ওর একনিষ্ঠ ছাত্র। খুবই মনোযোগ দিয়ে আমাকে শেখাতো কীভাবে বাজাতে হয় গীটার। ও-ই আমার সংগীতের শিক্ষক। কিন্তু ছাত্র একনিষ্ঠ হলেও, গীটার ব্যাপারটাই তখন আমার কাছে দুর্বোধ্য লাগতো। সুর তুলতে পারতাম না। বরং নিজের ইচ্ছেমতো গীটার বাজাতেই বেশি ভালো লাগতো।

সেরকমই একটা দিনের কথা। যে যার মতো কথা বলছে। কেউ শুনছে কেউ বসে আছে, বা শুয়ে আছে। ইউনানী সিগারেট খেতে উঠে গেলে আমি গীটার নিয়ে নিজের মনে টুং টাং করছি। নিজের সংগীতে নিজেই মুগ্ধ হয়ে শুনছি চোখ বন্ধ করে।

হঠাৎ মনে হলো আশেপাশে বেশ নীরবতা। চোখ খুলে দেখি সামনে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ গম্ভীর। আমার কাছে মনে হলো সে রেগে আছে। আমি গীটারটা পাশে রেখে তার দিকে তাকালাম। মনে করতে পারছি না আমি কোথায় অপরাধ করলাম?

সে আরেকটু ঝুঁকে এলো আমার দিকে। মুখের অবস্থা আরও বিকট করে ঠাণ্ডাস্বরে জানতে চাইলো- যেই জিনিসটার ব্যবহার জানো না সেইটা নিয়ে নড়াচড়া করো কেন খোকা?

বেশ অবাক হয়ে নিজের দিকে তাকালাম। আবার মেয়েটির দিকে তাকালাম। আমি খোকা? সে কি বুড়ি?

আমিও যতোটা সম্ভব গলা শান্ত রেখে বললাম- তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য দিদিভাই।

ভেবেছিলাম আমার কথা শুনে কুপোকাত হয়ে যাবে। একটু ভ্যাবাচেকা খাবে। কিন্তু সেই দ্বার দিয়েই গেলো না। উল্টো জানতে চাইলো- কী কারণে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছিলা? আমার সাথে প্রেম করবা?

মাগো! বলে কি! তাকে ভ্যাবাচেকা খাওয়াতে গিয়ে আমিই চিৎপটাং। আমার এতোগুলো বন্ধুর সামনে আমাকে এভাবে কুপোকাৎ? হারামীগুলোও কেমন চুপ মেরে আছে। কেউ একজনও সাপোর্টে আসছে না। মেজাজটা তাই তিরিক্ষি হয়ে উঠলো।

মেয়েটির দিকে তাকিয়ে জবাব দিলাম- ঠিকই ধরছো। তোমার সাথে প্রেম করতে চাই। গত নয় বছর ধরে তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। প্রস্তাবটা যেহেতু তুমি-ই দিলা, ব্যস হয়ে গেলো। আমি রাজি।

বাইচলামি করো আমার সাথে? নয় বছর ধরে তুমি আমারে দেখছো মানে? বাংলাদেশেই তো আছি দুই বছরের কম সময় ধরে। তুমি নয় বছর ধরে আমাকে দেখছো কীভাবে?

ওহ হো, মনে পড়ছে। বাংলাদেশে আসার আগেতো তুমি মঙ্গল গ্রহে ছিলা। ঐখানেই তোমাকে দেখছি। আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে। তখন অবশ্য তুমি অতো বদমেজাজি ছিলা না। অনেক কিউট ছিলা। মনে হয় মধুর কার্য়কারিতা কমে গেছে! আফসোস।

মেয়েটি কী একটা বলতে যাচ্ছিলো। তার আগেই ইউনানী প্রবেশ করলো। যেকোনো পরিস্থিতি খুব ঠাণ্ডা মাথায় ট্যাকল দিতে পারে আমার এই বন্ধুটি। আমি তাই নিশ্চিন্ত মনে আনন্দিত হলাম। ইউনানীর হাতে মেয়েটি এখন কীভাবে নাস্তানুবাদ হবে সেইটা চোখের সামনে দেখতে পেয়ে বেশ পুলকিত হলাম।

আমাকে মুচকি হাসতে দেখে মেয়েটি এই প্রথম অবাক হলো। তারপর একবার ইউনানীর দিকে তাকালো। মাত্র ও এসে দাঁড়িয়েছে, কথা বলারও সুযোগ হয়নি। তার আগেই মেয়েটি খপ করে আমার হাত ধরে এমন হেঁচকা টান মারলো, আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম।

তারপর ইউনানীর দিকে তাকিয়ে বললো- তোমার এই বন্ধুটি আমার সাথে কিছুক্ষণ প্রেম করলে তোমাদের আপত্তি নেই তো?

ইউনানী আস্তে করে বললো- নেই!

কিন্তু মেয়েটি সেই কথা শোনার জন্য দাঁড়িয়ে নেই ততক্ষণে। আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে টিএসসির বাইরে। আমি একান্ত বাধ্য ছেলের মতো হেমিলিওনের বাঁশিওয়ালীর পেছন পেছন এক প্রকার দৌঁড়ে যাচ্ছি।

.
তিন.

পরে লেখা হবে…

লেখা সম্পর্কে আপনার মতামত দিন...