ফিচার

যে কথা ব্যক্তিগত

One girl whispering a secret to another girl
লিখেছেন: পান্থ বিহোস

বলা হয় মনের কথা কাউকে না কাউকে বলতেই হয়। নয়তো জীবনে সুখ নামক ব্যাপারটা স্বচ্ছ থাকে না। হয়তো একথা মিথ্যে নয়। কিন্তু মনের কথা আর ব্যক্তিগত কথা কি এক? এটা নিয়ে তর্কে যাবো না আমরা। তবে একথা তো সত্য যে, ব্যক্তিগত ব্যাপারেও আছে রকমফের। যেমন কিছু ব্যক্তিগত কথা আছে যেগুলো মা-বাবা বা নিজের আপন বোন-ভাই ছাড়া আর কারও কাছেই ব্যক্ত করা যায় না। আবার কিছু কথা আছে যেগুলো আর সবার কাছে বলা গেলেও মা-বাবা বা বোন-ভাইয়ের কাছে বলা যায় না। তেমনি কিছু কথা শুধু বন্ধু-বান্ধবীর জন্য আবার কিছু কথা শুধু নিজের জীবন সঙ্গিনীর জন্যই বরাদ্দ থাকে। আর কিছু কথা আছে যেগুলো শুধুমাত্র নিজের আপন সত্ত্বার জন্যই সংরক্ষিত থাকে আজীবন। যা বলা যায় না কাউকে, যা ব্যক্ত করা যায় না কারও কাছে। কখনও কখনও দেখা যায় এসব একান্ত ব্যক্তিগত কথা মানুষকে কুড়ে কুড়ে খায়। জীবনকে ধ্বংস করে দেয়। কেউ কেউ আবার আত্মহত্যাও করে বসেন অব্যক্ত কথা ব্যক্ত করতে না পেরে। এটা যেমন কষ্টকর তেমনি বেদনাদায়কও। কিন্তু যদিও বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন এরকম ব্যক্তিগত কথা ব্যক্তিগত থাকাই শ্রেয়। যদিও কিছু মহামণিষী আবার তা অনায়াসে ব্যক্তও করে গেছেন জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে।

কোন্ কথা ব্যক্তিগত?

হুম, সত্যি কথা বলতে কি, এরকম কোনো মিটার নেই যা দিয়ে মেপে বলা যাবে কোনটা ব্যক্তিগত আর কোনটা নয়। এটা সম্পূর্ণই আপনার একান্ত ব্যাপার। এটাকে অনুধাবন করতে হয় নিজের কমনসেন্স দিয়ে। আপনি নিশ্চয় মা-বাবার সামনে গিয়ে চিল্লিয়ে গান গাইবেন না, বা অশ্লীল কথা বলবেন না। কিন্তু ঠিকই কিন্তু বন্ধুদের আড্ডায় এসব অনায়াসে করেন। আবার গার্লফ্রেন্ডের সামনে গিয়ে ঠিকই সুবোধ বালক সেজে সুন্দর সুন্দর কথা বলেন। তো এসব কীভাবে হয়? এসব হয় কমনসেন্স ইউজ করে। কমন ম্যানার জানার কারনে। তেমনি কোন কথাটা কোথায় বলা যায় আর কোনটা ব্যক্তিগত আর কোনটা একান্তই আপনার তা কিন্তু আপনাকেই নির্ণয় করতে জানতে হবে।

ব্যক্তিগত কথা কাকে বলবো?

একবার বন্ধুরা মিলে আয়োজন করেছিলেন কোনো একটা সেলিব্রেশন পার্টি। সেখানে কোনো এক গার্লফ্রেন্ডকে একান্তভাবে চুমু খেয়েছিলেন। সে কথা কি কখনো নিজের স্ত্রীর কাছে বলা যায়? যদিও অনেক ছেলেই এরকম কথা বন্ধুদের কাছে বলে বাহবা কুড়িয়ে থাকেন। কিন্তু নিজের বউয়ের কাছে তো আর এসব বলা যায় না!

আবির খুবই সৎ ছেলে। কিন্তু অফিসের পিকনিকে ওকে যখন দায়িত্ব দেয়া হয় খাওয়া-দাওয়ার, অনায়াসেই সেটা পালন করেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ কী ভেবে খরচের খাত একটু এদিক সেদিক করে হাজার দশেক টাকা নিজের পকেটে চালান করে দিয়েছিলেন। এই কথাটা কি আবির কোনোদিন কারও কাছে বর্ণনা করতে পারবেন?

অরুণা কর্মকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। অবিবাহিত। একদিন ক্লাসে পড়াতে গিয়ে ভালো লেগে যায় একটা ছেলেকে- উনার ছাত্র। আর এর কিছুদিন পরেই অরুণা কর্মকারের বিয়ে হয়ে যায় একই ভার্সিটির অন্য এক শিক্ষকের সাথে। এ কথা কাউকে বলা যায়?

তো এসব ব্যাপারগুলো লক্ষ্য করলে বলতে হয়- কিছু ব্যক্তিগত কথা অবশ্যই ব্যক্তিগত থাকা প্রয়োজন। অথবা এভাবেও বলা যায়- যে কথা আপনার নিজের স্বত্বাকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়া করিয়ে দিতে পারে সেগুলো নিজের মাঝে লালন করাই দায়িত্ব।

কষ্ট বুকে লালন নয়

যদি এমন হয় যে, আপনি ব্যাপারটা সইতেও পারছেন না আবার বললেও সমস্যা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে কী করবেন? কষ্ট বুকে জমাট বেধে রাখবেন? এ থেকে কি কোনো পরিত্রাণের উপায়ই নেই? আছে। কীভাবে? চলুন জেনে নেয়া যাক বিশেষজ্ঞদের বারতা।

কোয়ান্টাম মেটিডেশনের জনক শহীদ আল বোখারী মহাজাতক বলেন- যদি এরকম পর্যায় হয়, সেক্ষেত্রে নিজের মনের ব্যক্তিগত কথাগুলো কাগজে লিখে ফেলুন। তারপর সেটা আগুনে পুড়িয়ে ফেলুন। নিজের ভেতর প্রশান্তি লাভ করবেন।

তো আপনিও তাই করুন না কেন? দেখুন না এতে যদি নিজের মনের একান্ত ব্যথাগুলো হয় দূর তবে মন্দ কী? দুঃখ নিজের মাঝে লালন করার চেয়ে সেটা যদি সবার অজান্তে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া যায় তাহলে সেটাই তো হতে পারে সবচেয়ে ভালো।

অরণ্য রোদন নয়

যা দরকার নেই তা নিজের মাঝে ধারণ করে কোনো ভালো ফল আশা করতে পারেন না অন্তত। কেন? কারণ অপ্রয়োজন সেটা। অনেক সময় আমরা কিছু ব্যাপারে খুবই হেজিটেশনে ভুগি। যেমন কাউকে হয়তো ভালো লেগেছে। কিন্তু মুখ ফুটে সেটা বলা হয় না। হয়তো তখন বলার প্রয়োজনিয়তা ফিল করি যখন ভালো লাগা মানুষটা অন্যত্র বিয়ে করে ফেলেন। কিন্তু সেই সময় আর বলে কী হবে? কিংবা তখন হায় হায় করেও তো কোনো প্রতিকার পাওয়া সম্ভব নয়। তাই সময় থাকতেই সময়ের কাজ করতে হবে। আর সঠিক স্থানে সঠিক কাজটি করতে হবে। অরণ্য রোদন করা যেমন বারণ তেমনি অপ্রয়োজনীয় কথা নিজের মাঝে জমা না রাখাও বারণ। সুতরাং কী করবেন আর কী বলবেন তা বুঝে নিন পরিস্থিতি অনুযায়ী।

হয় না যেন কারও ক্ষতি

অনেকে মনে করেন ব্যক্তিগত কথা বলতে কিছু নেই। নিজের মনের একান্ত কথাগুলো কাউকে না কাউকে বলতেই হবে। না বলা পর্যন্ত শান্তি হয় না। কিন্তু আপনি কি খেয়াল করেছেন- আপনার এই বলার কারণে অন্যজনেরও এতে করে বিরাট ক্ষতি হতে পারে? নাকি শুধু একপক্ষীয়ভাবে নিজের কথা ভেবেই কাজ সারতে চাচ্ছেন? এমনটা কখনও করা যাবে না। স্বার্থপরতা বাদ দিয়ে যেকোনো কিছু বলার আগে নিজের সাথে নিজে ভালো করে যাচাই বাছাই করে নেবেন। এতে করে আপনার লাভ না হোক, অন্যজনের অন্তত ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

সমাপ্তিকথন

ব্যক্তিগত কথা নিজের মাঝে চেপে রাখা যেমন ভালো নয়, তেমনি সব ব্যক্তিগত কথা সবার সাথে শেয়ার করাও ভালো ফল বয়ে আনে না। আবার কিছু কিছু ব্যক্তিগত কথা আছে যা কারও কাছেই শেয়ার না করাই শ্রেয়। এই বোধটা নিজের মাঝে লালন না করা পর্যন্ত ব্যক্তিগত কথা ব্যক্তিগত থাকাই সবদিক থেকে উৎকৃষ্ট। মনের জানালা আপনার আরও প্রসারিত হোক। কথাকে নিজের মাঝে লালন করার শুভকামনা।

লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:

_._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._._

টি মন্তব্য | আপনিও মন্তব্য লিখুন...

লেখক সম্পর্কে জানুন:

পান্থ বিহোস

ভবিষ্যতে ফুলটাইম লেখক হিসেবে প্রফেশন তৈরি করার ভাবনায় আপাতত ফুলটাইম ভাবুক। আর পার্টটাইম ওয়ার্কার।